ঈশ্বর
[Best viewed in IE or Chrome]
তুমি জানতে চেয়েছ, ভগবান নিয়ে কিছু যদি লেখা যায়। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা যদি জানতে চাও, তাহলে হয়ত কিছু বললেও বলতে পারি। জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতির সম্মুখীন আমাদের হতে হয়, যা আমাদের অনেকসময়ই বোধগম্য হয় না। কিন্তু তুমি একটা পথ চাইছ, কিছুতেই তা খুঁজে পাচ্ছনা, তখন যদি একান্ত মনে গভীরভাবে সেটা নিয়ে চিন্তা কর, অনেকসময় দেখা গেছে কোনও না কোনও একটা পথ বেরিয়ে আসে।
আমরা সবাই কত কত মন্দিরে যাই, মানত করি, আমাদের আশা যেন পূর্ণ হয়, তার জন্য কত কিই করি, কিন্তু আমরা কি সবাই মনের ভিতর খুব বিশ্বাস রাখি তাঁর উপর ? যদি বিশ্বাস থাকে, তাহলে কি আমরা কখন আমাদের আশা পূর্ণ না হলে তাঁর উপর রাগ করতে পারি ? আমরা কত সহজেই তাঁর উপর রাগ করে ফেলি, আমাদের নিজেদের অজান্তেই আমরা তাঁকে কত কথা শোনাই, কত কত অভিযোগ করি আমাদের কথা শুনল না বলে।
সত্যি যদি বিশ্বাস থাকে, তাহলে তুমি কোনদিনও তাঁর ওপর রাগ করতে পারবে না, সুখের সময় যেমন তাকে স্মরণ করবে দুঃখের সময় দেখবে তিনি তোমার আত্মাতে বসে আছেন। তিনিই তোমার চোখের জল মুছে তোমাকে স্বর্গের সুখ অনুভব করাবেন।
এই পৃথিবীতে আমরা সবাই সবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছি। সেটা অনুভুতির ব্যাপার, অনুভূতি কাউকে বোঝানো যায় না। সেটা সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। আমি তো মনে করি আমাদের প্রত্যেকের ঘরই এক একটা মন্দির। সেখানে আমাদের বিগ্রহ বসে আছেন। আমাদের সকলকে রক্ষা করছেন। যারা আমাদের চারপাশে রয়েছে আমরা যেন তাদের সবাইকে নিয়ে খুব সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাতে পারি – সেটাই যেন আমাদের নিত্য পূজোর অঙ্গ হয়। তিনি আমাদের মধ্যেই বিরাজমান। খুব পূজো করছি কিন্তু বাইরে লোকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছি, তাহলে যেন আমি মরমে মরে যাই। সবকিছু যেন বৃথা হয়ে যাবে, তাই সকলের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক রেখে আমরা যেন এগিয়ে যেতে পারি।
আত্মবিশ্বাস
আত্মবিশ্বাস কথাটা আমাদের খুব পরিচিত। কখন কি আমরা এই শব্দটাকে নিয়ে চর্চা করেছি ? এর সত্যি অর্থটা কি হতে পারে আমরা কি সেটা নিয়ে কখন ভেবে দেখেছি ? অথচ আমাদের অনেকের মধ্যেই এই শব্দটার বড়ই অভাব। আসলে কিন্তু অভাব নয় , আমাদের মন বড়ই দুর্বল – এই দুর্বলতাই আত্মবিশ্বাসকে অবিশ্বস্ত করে তোলে।
যখন কোনও কাজ, কি করে করবো, কেমনভাবে করবো কিংবা কখন করব ? এই প্রশ্নগুলো পরপর আসতে থাকে, তখন মনের ঝড় কাটিয়ে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হয়।
অনেক কাজ যেগুলো আমরা করে থাকি, সেগুলো কি ভাবে করবো সেটা অনেকখানি নির্ভর করে নিজেদের ভাবনার ওপর। অবশ্য দরকার হলে কারোর সঙ্গে আলোচনা করে অনেকসময় সঠিক পথের হদিশ পাওয়া যায়। তবে হঠাৎ কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
আমাদের ইচ্ছেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া চাই সঠিক পথে চলার জন্যে। অনেকসময় দেখা গেছে এমন অনেক ভুল আমাদের দ্বারা ঘটে যায়, যা সারাজীবন ধরেও সংশোধন করা যায় না। তার একটা দাগ থেকেই যায়, শত চেষ্টা করেও তার দাগ মুছে ফেলা যায় না।
অতীতের অনেক কিছুই আমরা ভুলতে পারি না, তা আমাদের মনকে যেমন আনন্দ দেয় তেমনি আবার দুঃখও দেয়। সেইসব স্মৃতি থেকে সহজে বেরিয়ে আসা যায় না। আনন্দের ভাব খুব আনন্দ দেয়, আর দুঃখ মনটাকে ভারী করে রাখে।
তাই ব্যক্তিত্ব নিয়ে তাকে সযত্নে বোঝাতে পারলে মনটাকে খানিকটা হালকা করা যায়। ক্ষত পুরোপুরি হয়ত সারানো যায় না। কিন্তু যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে , তাকে খানিকটা হালকা করা যেতে পারে।
ভালো থাকতে গেলে আমরা অনেক সময় ভাবি যে বাইরের বাহ্যিক পরিবেশের ওপর আমাদের ভালো থাকা বা মন্দ থাকা নির্ভর করছে। সেটা কিন্তু সাময়িক। যদি আত্মস্থ হয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা যায়, তাহলে দেখব বাইরের পরিবেশ সেরকম বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে না।
আত্মস্থ অবস্থা আত্মবিশ্বাসেরই একটা স্তর বিশেষ। সেই রূপ আনতে গেলে অনেক সাধনার পথ পেরোতে হয়।আমরা যে কোনও কাজই করি না কেন , একবারে কি সব ঠিক ঠিক হয় ? কোনওসময় হয় , আবার কোনওসময় হয় না। যদি একবারে না হয় , তা বারবার করে ঠিক করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই। সেটাই সাধনা।
আত্মবিশ্বাসের অভাবই আমাদের দুর্বল করে দেয়। জীবনে অনেকরকম ঝড় – ঝঞ্ঝার মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে, কত সময় জীবন- যুদ্ধে হারতে হারতে আমরা জয়ী হই। তখনই আত্মশক্তির পরিচয় আমরা পাই। অনেকসময়ই আমরা নিজেদের অজান্তে কত বড় বড় বাঁধা অতিক্রম করে কঠিন পথ পেরিয়ে আসি।
আত্মবিশ্বাস থাকলে, যে কোন কাজই শান্তমনে করলে তার সুফল পাওয়া যায়। অনেকসময় অহংকার আমাদের পথের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের কি করনীয় সেটা ঠিকমত ভাবতে সাহায্য করে না। তাই আমরা মনে যেন সেই শক্তি রাখতে পারি, যেটা আমাদের অহংকারকে সযত্নে একপাশে সরিয়ে রেখে কাজগুলো করতে সাহায্য করবে। অনেকসময় আমরা অহংকারের বশবর্তী হয়ে খারাপ ব্যবহার করে ফেলি। কিন্তু আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে অহংকার যেন আমাদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তা যেন কাউকে আঘাত না করে ফেলে।
“আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলারও তলে, সকল অহংকার হে আমার, ডুবাও চোখের জলে”।
মনের কিছু কথা
আমরা কি কখনও কেউ ভেবে দেখেছি “মন” কি? মন আমাদের সমস্ত সত্তায়, দেহের অনু-পরমানুতে বিরাজ করছে। তাকে বাদ দিয়ে হয়ত আমাদের অস্তিত্ব থাকে; কিন্তু অনুভূতি কি কাজ করে? তাই মন আমাদের প্রত্যেকের জীবনে একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে বসে আছে।
আমরা কত সময় বলে থাকি – আজ আমার মনটা ভাল নেই, কোনও কাজেই যেন মন লাগছে না, কারোর সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না। সবসময় কেমন যেন একটা অস্থিরতার ভাব – কি করব না করব কিছুই যেন ভাবার শক্তিটাও নেই। অথচ ওরকম অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতেও ইচ্ছে করছে না। কি করব বা কি করা যেতে পারে, সেটা ভাবার ক্ষমতাটুকুও যেন নেই। এটা কিন্তু আমাদের বহির্মন – যা আমাদেরকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালিত করে। মনকে আমরা যদি দুভাগে ভাগ করে নিই, তাহলে দেখব একটা তার অতি পরিচিত রূপ। সে যখন যা ইচ্ছে হয় তাই করতে চায় – সে হল আমাদের বাইরের মন। আর একটা মন যে নাকি আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে বসে আছে, একান্ত নিভৃতে, সে সর্বক্ষণ কিন্তু নিজেকে নিয়ে বিচার করতেই থাকে।
“জীবন আমার চলছে যেমন তেমনি ভাবে, সহজ কঠিন, দ্বন্দে ছন্দে চলে যাবে” - সেই চলে যাওয়াটা কি অতই সোজা? তাহলে আজকে আমার এই নিয়ে লিখতে বসার দরকার হত না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি – যখন খুব টানাপড়েন, দ্বন্দ্ব চলে মনের ভিতর, তখন নিজের অন্তর মনে তলিয়ে গিয়ে আত্মবিশ্লেসন করে বার করতে হবে কোনটা ঠিক পথ।
“এ পথে আমি যে গেছি বারবার” – এ কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু যখন মনের ভিতর কোনও দ্বন্দ্ব চলে তখন যেন তাকে বিচার করে নিজেকে জয় করতে পারি। তবেই তখন বুঝতে পারব যে অন্তরমন বহির্মনের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে।
অনেক সময়ে দেখা গেছে, যখন পথ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন খুব প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে পারলে মনের ভার লাঘব হয়ে কেমন হালকা ভাব অনুভব হয়ে থাকে। তখন যেন মনে মনে বলতে ইচ্ছে করে, “বিষাদে হয়ে ম্রিয়মান , বন্ধ না করিও গান”। বেশ দুচারজনের সঙ্গে তখন যদি কথা বলা যায়, তবে খানিকটা মনে স্ফূর্তি ভাবটা ফিরিয়ে আনা যায়।
আবার কতসময় দেখা গেছে কোনও কারণ ছাড়াই মনটা আনন্দে ভরে গেছে। মনে হয় পৃথিবীর যত আনন্দ আছে সব যেন এই মনটাতে এসে জড় হয়েছে। সেই সময় বলতে ইচ্ছে করে “আমার মতন সুখী কে আছে”।
কিন্তু সেই আনন্দ কি আমরা বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারি? আসলে আমাদের মনে হয়, আনন্দ বড় ক্ষণস্থায়ী, কারণ মন খুব খুশী থাকলে সময় কোথা থেকে যেন চলে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। কিন্তু বিশ্লেষণ করে দেখলে বোঝা যায়, দুঃখকষ্ট যেন অনেক অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আছে মনে হয়, কিন্তু সত্যি কি তাই? বিষাদের মন যেন সময়কে পার করতে জানে না – এক এক মুহুর্ত যেন এক এক ঘণ্টা বলে মনে হয়। ওদিকে আনন্দের মন কিন্তু ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলে। তখন গান গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, “প্রানভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ”।
আনন্দ দুঃখ মিলেমিশেই আমাদের সকলের জীবন। মাঝে মধ্যে মন আমাদের বড়ই বিচলিত হয়ে থাকে। কেন যে এরকমটা হয়, তার তল কি আমরা কখনো খুঁজে পাবার চেষ্টা করি, কিংবা করতে চাই কি? দেখা গেছে কোনও একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকলে, তার একটা ফল পাওয়া যায়। সেটা যদি ভালো ভাবনা হয় তাহলে তা ভালোর দিকে যায়, কিন্তু তা যদি দুঃখ কিংবা রাগের প্রকাশ হয়, তাহলে তার প্রবাহ বিষাদের দিকে ধাবিত হয় । আমরা কত সময় বলে থাকি, সুখদুঃখ ওতপ্রোত জড়িত, কিন্তু মনের গভীরে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে কি কখনো ভাবি?
কোন সময় খারাপ খবর কিছু শুনলে (সে যে রকমই হোক না কেন) – তৎক্ষণ আমাদের মন বিষাদে ছেয়ে যায়। মনের গভীর সত্তায় তখন যদি বিচার বিশ্লেষণ করে বোঝানো যায়, তাহলে হয়ত সেই ভার অনেকটা হালকা অনুভুত হয়। সেই অবস্থায় যেন পরমাত্মাকে ডেকে বলতে পারি – “এ বোঝা আমার নামাও বন্ধু নামাও”।
আমরা এ পৃথিবীতে এসেছি, তা আমাদের পরম সৌভাগ্য। তাকে নিয়ে আমরা কি করব, কি ভাবেই বা কাটাবো তার সবটা না হলেও অনেকটা দায়িত্ব যেন আমাদের থেকে যায়। আমার নিজের কথায় বলি, ভগবানের চরণে যদি শুদ্ধমনে নিজেকে সমর্পন করা যায়, তার মত আনান্দ বোধহয় আর কিছুতে পাওয়া যায় না। “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”। আমরা সবাই এক একজন এক একপ্রকার, তাই মনের ভাবও নানারকমের হয়।
কালের স্রোতে আমরা সবাই ভেসে চলেছি, এ কথা কোনভাবে কেউ অস্বীকার করতে পারব না। মন দোলাচল হলে তিনই তার হাত ধরে শান্তির আলয়ে নিয়ে যান। “বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও”। তিনি কাউকে কখন ফেরান না। সকলের জন্য সবসময় সর্ব অবস্থায় তিনি বিরাজমান।
“আমার বিচার তুমি কর তব আপন করে”। অজান্তে আমরা অনেকসময় অনেক কাজ করে ফেলি। সেটা ভালো কি খারাপ তার বিচারের মধ্যে না হয় নাই গেলাম। তিনি কিন্তু ভালো মন্দ বিচার না করেই সকলকে অন্তরে গ্রহণ করেন। তাই তার আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিতে পারলে খুব নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
আমরা অনেক সময় দেখি নিজেরা যে ভাবে ভাবতে ভালো লাগে, সেই ভাবে সেই পথেই চিন্তাধারা চলতে থাকে। ভালো বই পড়া, ভালো কথা চিন্তা করা, ভালো গান শোনা, ভালো সিনেমা দেখা, ভালো জায়গায় বেড়াতে যাওয়া – সবকিছুর মধ্যে যেন আনন্দের ভাবটা জুড়ে থাকে।
আমরা সবাই আমাদের মত করে বাঁচতে চাই। তার জন্য অনেকরকম রাস্তা আছে। তা সে মসৃণও হতে পারে, আবার কাঁকড় বিছানোও হতে পারে। কোন পথে আমরা চলবো, তা আমাদের নিজেকেই ঠিক করতে হবে। সেটা ভেবে ঠিক করারও একটা প্রস্তুতি আছে।
আমরা বড় হতে থাকি বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে। ছোটবেলায় মা-বাবার স্পর্শে (বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে) আমাদের বিকাশ ঘটতে থাকে। তাঁরা তখন শিশুমনে আয়নার কাজ করে । তাদের থেকেই কিন্তু পছন্দ-অপছন্দ, ভালমন্দ, রুচি মনকে পুষ্ট করতে থাকে। ছোট বয়সে আমাদের দ্বারা অনেক ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়। সেই ভুলের মধ্যে দিয়েই যেন আমরা নিজেদেরকে সংশোধন করে নিতে পারি।
আমরা কখন কেউ বড় গলা করে বলতে পারি না যে, আমরা যে কাজটা করি, সেটা সর্বতোভাবে সঠিক। কারণ আপাতদৃষ্টিতে এই কথাটা কোন অর্থ বহন করে না। একেকজনের কাছে মনের প্রকাশ এক-একরূপে ফুটে ওঠে।
তাই আমরা যে কাজটাই করি না কেন তা যেন সমগ্র সত্তা দিয়ে অন্তরে নিয়ে করতে পারি। সেটাই সব সঠিক কাজের পথ দেখিয়ে দেবে। মন বা হৃদয় যদি না থাকে, তাহলে কোন কাজটাই পূর্ণতা পেতে পারে না।
আমরা অনেকসময় বলে থাকি, যে কাজটা আমরা করি সেটা পারফেক্ট ভাবে করি। সেটা কি সবসময় সত্যি? “নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান”।
কৃত্রিম কোনও কিছুই বেশিদিন স্থায়ী হয় না, তার সত্যিকারের স্বরূপ প্রকাশ পেয়েই যায়। অন্তরের অন্তস্থল থেকে যে কাজ করা যায় সেটা চিরসত্য হয়ে থাকে। তাই আত্মার কাছে নিজেরা প্রশ্ন করে উত্তর না দিতে পারার অবস্থা যেন কোনওসময় না আসে।
এর জন্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। আসলে আমাদের মধ্যে যে ইন্দ্রিয়গুলো আছে, তাদেরকে নিয়ে ভাবতে হবে। সেই ভাবনাটাওমনের বিশেষ অবস্থা। মন আমাদের সব সময়ই চঞ্চল, চারিদিকে ছুটে বেড়াতে চায়। প্রথমে তাকে বোঝাতে হবে, সে কি চায়; সেই ভাবটাই আত্মবিশ্বাসের প্রথম সোপান।
নিজের মনকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখাটাও একরকম শিল্পী মনের পরিচয়। আত্মবিশ্বাস আমাদের যে শক্তি দেবে তার আভাস আমরা জীবনের প্রতিপদে অনুভব করতে পারব।
“বিপদে মোরে রক্ষা কর, এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়”। আমাদের মন যেন কোনও অবস্থাতেই ভয় না পায়। ভয় মনকে বড়ই দুর্বল করে দেয়। তখন কোনও কিছু ভাবার ক্ষমতাও লোপ পেয়ে যায়।
সেরকম রাগের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা বলা যায়। ক্রোধ মানুষের সবচেয়ে বড়ো শ্ত্রু – তা আমাদের বড়ই ক্ষতি করে, শরীর ও মন দুইয়ের ওপর তার প্রভাব আমরা এড়াতে পারি না। তাই রাগ না করে যদি মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করা যায়, তাহলে সহজেই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।
আবার অনেকসময় একই কাজ আমরা বারবার করে থাকি। সেটা যে সবসময় সঠিক হয় তাও না, কিন্তু মন তা সামলাতে পারে না, কি যেন এক অজানা আকর্ষণে মন তার পেছনে ছুটতে থাকে। কিন্তু পরক্ষনেই অনুতাপের মেঘ এসে আমাদের মনের আকাশ কালো করে দেয়।
যে কথা বলা হয়ে যায় বা যে কাজটা করা হয়ে যায়, সেটাকে আর ফেরানো যায় না। তা ভালই হোক বা খারাপই হোক – তাই কোনও কাজ করার আগে যদি আমরা একান্তে নিবিড়ভাবে মনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাই, তাহলে হয়ত অনেক অপ্রিয় জিনিষের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারব।
সাধনার প্রয়োজন সেইখানেই। আত্মমগ্ন হয়ে যদি কোনও কাজ করা যায়, সেই একই কাজ করতে করতে সেটাই সাধনায় গিয়ে পৌছয়।
“নিবিড় ঘন আঁধারে , জ্বলিছে ধ্রুবতারা”। জ্ঞান কিন্তু তখনই সুন্দর, যখন তা অহংকারকে সংযত করে প্রকাশ পায়।
অনেক সময় এমন অনেক অদ্ভুত কাজ আমাদের করতে ইচ্ছে করে, যার আপাতদৃষ্টিতে কোনও মানে হয় না। কিন্তু তা যদি ক্রিয়েটিভ হয় তাহলে নিশ্চয়ই তাকে সুন্দরের রূপ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা যদি ক্ষতিকারক হয়, তা থেকে নিবৃত্ত থাকাই ভালো।
সকলে আমরা ভাল্য-মন্দয় মিলিয়ে বড়ো হয়েছি। সমাজের পথে চলাকালীন আমাদের সামনে নানারকম প্রলোভন, ভালো খারাপ সবরকম ছবি আসতে থাকে। কিন্তু কে বিচার করবে কোনটা ভালো, কোনটাই বা মন্দ? “মন রে মোর পাথারে, হসনে দিশাহারা” – এই কথা মনে করে যেন দ্বন্দ কাটিয়ে উঠতে পারি। মন যেন সর্বদা কর্মব্যস্ত জীবন কাটাতে পারে। কর্মই মনের মলিনতাকে ম্লান করে দিয়ে আলোর পথে নিয়ে যাবে। মনের মত কাজ যদি নাও করতে পারি, তাহলে যেন সমাজ, পারিপার্শ্বিক, কিংবা ব্যক্তি বিশেষ কারোর ওপর যেন দোষ দিয়ে না ফেলি। যেন বলে উঠতে পারি “প্রেমানন্দে রাখো পূর্ণ আমারে দিবসরাত”।
আনন্দের মধ্যে মন পূর্ণতা পায়। মনের সৌন্দর্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভালো কথা ভাবা ভালো কাজ করা যে ভাবেই হোক না কেন নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত রাখতে হবে। দুঃখে বিপদে তখন যেন বলতে পারি “আরও আঘাত সইবে আমার” - আঘাতের কষ্টিপাথরে মনকে যাচাই করে আমরা যেন আমাদের অন্তরকে খাঁটি সোনায় পরিণত করতে পারি। “সকল কলুষ তামস হর , জয় হোক তব জয়। অমৃতবারি সিঞ্চন কর নিখিল ভুবনময় – মহাশান্তি, মহাক্ষেম, মহাপুন্য, মহাপ্রেম”।